বনবিবির দেশে
গল্পটার শুরু ২০১৩ এর শুরুর দিকে। প্রেসিডেনসি
ইউনিভার্সিটি তে জুলজি নিয়ে ঢুকেছি মাস ছয়েক হবে। কে বলল বেশ মনে নেই। শুনলাম
সিনিয়ার দের একটা এক্সকারসন আছে। কোথায়? না সুন্দরবন। বাহ, কিন্তু আমি তো পড়লাম মুশকিলে
অনেক গুলো দিক থেকে। প্রথমত, বাড়িতে বলা এবং পারমিশন পাওয়া টা একটা জটিল সমস্যা
ছিল। কারণ এতে আমাদের কোন মার্ক্স ছিল না। বেপারটা কম্পালসারিও ছিল না। গোঁদের ওপর
বিষফোঁড়া হল সামনেই ছিল সেমেসটার। তবে বাড়িতে রাজি করাতে যে আমাকে একেবারেই বেগ
পেতে হয়নি এটা ভাবলে আমি আজও অবাক হই। প্রথমে দল টা বেশ ভারি ই মনে হছিল। একটা সময়
পর একে একে অনেকেই যখন এক্সিট গেট এ দাঁড়িয়ে তখন একবার মনে হয়েছিল বটে যে কি হবে গিয়ে? তার থেকে বরং পড়ায়
মন দিলে বেশি কাজে দেবে। এমনি এক
দোদুল্যমান সময়ে এসে হাজির হল দ্বৈপায়ন। আমাদের কথা বলা যদি এখান থেকে শুরু
হয়ে থাকে তবে এটাও বলে রাখা ভালো যে
পরবর্তী ছবছরের প্রতিটা জার্নি তে ওকে পেয়েছি প্রতিবার, ছোট হোক বা বড়।
আমি আবার
বেশি রাত জাগতে পারিনা। কোনদিন ই। ঘরের মোষ বনে তাড়িয়ে এসে বাপের হোটেল এ ডিনার
সেরে শুতে যাব। ওদিনের মত শেষবার ফেসবুকে চোখ বুলোতে ঢুকলাম। দেখি চাটবক্স এ কে
যেন কড়া নাড়ছে। দ্বৈপায়ন। এদিক সেদিক কথার পর ও বলল “কিরে যাচ্ছিস তো?” ওমা তবে
কিছু লোক যাচ্ছে বটে। খানিক ভরসা পেলাম। শেষমেশ ঠিক হল যাচ্ছি সুন্দরবন।
কেনাকাটা
শুরু হয়ে গেল। লিস্ট এর পর লিস্ট। অল্প-বিস্তর পড়াশুনো। আলোচনা। কিভাবে যাবো, কদিন
থাকব, কি কি নেবো সে এক আলাদা উত্তেজনা। যাবার আগের দিন সেকি তোড়জোড়। রাকস্যাক
কেনা থেকে ওআরএস কোনওকিছুর ত্রুটি নেই। দেখে যে কারোর মনে হওয়া স্বাভাবিক যে
নিঘঘাত এভারেস্ট এক্সপেডিশন এ যাচ্ছি। অ্যালার্ম দিয়ে তাড়াতাড়ি শুতে গেলাম। পরদিন তাড়াতাড়ি
ওঠা।
১লা এপ্রিল,
ঘুম ভাঙল
চারটের সময়। অ্যালার্ম টা তখন ও বাজেনি। উঠে পড়লাম। মুখে ব্রাশ গুঁজে গেলাম
বারান্দায়। পূব দিকে ভোরের শুক্তারা টা জ্বলজ্বল করছে। অ্যালার্ম টা বুঝি এখন
বাজছে। স্নান সেরে যখন বেরলাম তখন পূব আকাশ টা আস্তে আস্তে লাল হয়ে উঠেছে। মনে হল,
প্রতিদিনের এই চেনা সকাল টা সত্যি ই কি কাল অন্যরকম লাগবে? একটা সম্পূর্ণ অন্য
জায়গা থেকে।
যাক সেসব কথা,
বলা ছিল সকাল সাত টার মধ্যে কলেজ ক্যাম্পাস এ পৌছতে হবে। সেইমত পৌঁছে গেলাম। একটা
বড়সড় বাস গেট এর সামনে দাঁড়ানো। আর তাতে ঘপাঘপ মাল বোঝাই হছে। বুঝতে অসুবিধা হল না
ওই বাস এই আমাদের গন্তব্য প্রতীক্ষ্যমাণ। অরিত্র আর কয়েকজন দেখি কিসব বড় বড়
জিনিসপত্র বাস এ তুলছে। দেখে আমিও খানিক এগিয়ে গেলাম। আস্তে আস্তে ভিড় বাড়ল।
মোটামুটি আট টার দিকে কলেজ গেট থেকে বাস ছাড়লো। কলেজ স্ট্রিট তখন ও তার পরিচিত রুপ
পায়নি। বাস সোজা মৌলালি হয়ে ন্যাশনাল মেডিকেল
কলেজ পেড়িয়ে তপ্সিয়ার ভেতর দিয়ে সোজা গিয়ে উঠলো ইস্টআরন মেট্রোপলিটান
বাইপাস এ। রাইট টার্ন নিয়ে সায়েন্স সিটি কে ডান হাতে রেখে বাঁদিকে চলে যাওয়া
বাসন্তি হাইওয়ে তে যখন উঠলাম তখন পেছনে সকালের কলরবমুখর কল্লোলিনী আর সামনে
পুরোটাই অজানা।
সাথে রয়েছেন গ্রউপ ক্যাপ্টেন কেবি স্যার। আর তাঁর সাথে এস এম স্যার, পূজা ম্যাম, অম্লান স্যারেরা।
বাস চালাচ্ছেন হরেন দে। ওর আসল নাম টা আর জানা হয়নি। হর্ন এর বহুল প্রয়োগ এর কারনে
এরুপ নামকরণ। বাঁদিকের জানলায় আমি বসে আছি। ভাঙ্গর, মিনাখান পেড়িয়ে মোটামুটি পূব দিকে চল্লিশ কিমি যাবার পর রাস্তাটা বাঁক
নেয় দক্ষিণ দিকে। এরপর দক্ষিণে আরও প্রায় পঞ্চাশ কিমি পথ। রাস্তার অবস্থা সেসময়
খুব একটা ভালো দেখিনি। ৯০ কিমি পথ যেতে ঘণ্টা তিনেক সময় লেগেছিল। একে একে
সোনাখালি, বাসন্তি পেড়িয়ে বাস গিয়ে থামল গোদখালি তে। ঘড়িতে বেলা তখন প্রায় ১১ টা
হবে। বাস এ এক রাউনড খাবার দাবার এর ব্যবস্থা ছিল। আর মোটামুটি বন্ধু-বান্ধব দের
জমজমাটিতে কখন যে তিন ঘণ্টা পেড়িয়ে গেছে বুঝতে পারিনি কেউ ই। সিনিওর রাও তখন
বন্ধুসম। আর স্যার-ম্যাম দের প্রশ্রয় তো ছিলই। বাস থেকে নেমে দেখি ধুধু প্রান্তর।
কোথাও কিছু নেই। আস্তে আস্তে আমাদের মালপত্র সব নামছে।
![]() |
| গোদখালিতে প্রথম পর্বের যাত্রা-শেষে |
কিছু
দূরেই দুটো লঞ্চ দাঁড়িয়ে। আমাদের বলা হল একটায় উঠে যেতে। আচ্ছা এই লঞ্চ, নৌকা তে
ওঠা নামাটা বেশ মজার। বিশেষত মোহনার নদী গুলোতে তো বটেই। সকালে বেরনোর সময় হয়ত
কোনও অসুবিধাই হয়নি চড়তে। আসলে তখন ভাঁটা চলছে। বিকেলে ফেরার সময় দেখা গেল জোয়ারের
কারণে জলস্তর ৭-৮ ফুট বেড়ে গেছে। তখন আবার বড় বড় কাঠের পাটাতন ফেলা হয় উঠে আসার বা
নামার জন্য। যা হোক, আমরা উঠলাম এম বি গরজন এ। সাথে কে বি স্যার, এস এম স্যার। আর
অন্যটায় ফিসিওলজি আর বোটানির বন্ধুদের সাথে অম্লান স্যার আর পূজা ম্যাম। লঞ্চ
এগিয়ে চলল বিদ্যাধরী বেয়ে, তার ছোট ছোট শাখা-উপশাখায়। দুপাশে ঘন জঙ্গল।
কোথাও
কোথাও হলুদ জাল দেওয়া রয়েছে বাঘেদের জন্য। এরকম দৃশ্য আগে টিভি এর পরদা ছাড়া বিশেষ
দেখিনি। সুন্দরবন তখন আমার কাছে ডিসকোভারি তে দেখা অ্যামাজন এর জঙ্গল এর থেকে কোনও
অংশে কম নয়। চারপাশে ম্যানগ্রোভের সোঁদা গন্ধ। এপ্রিল এর মদ্ধ্য-দুপুরে পারদ মনে করি
৩৫ এর কম হবে না। আর তার ওপরে অসম্ভব আদ্রতায় ঘেমে-নেয়ে একাকার অবস্থা। ডিহাইড্রেশন
থেকে বাঁচতে সাথে আছে পর্যাপ্ত ও-আর-এস। এরই মধ্যে প্রতি মুহূর্তে এক রাশ উত্তেজনা
নিয়ে ঘন জঙ্গল এর দিকে লক্ষ রেখে চলেছি কোথাও পাতা নড়ার কোনও আভাস পাওয়া যায় কিনা।
ডেক এর ওপরে সবাই বসে আছি। নিচ তলাটায় শোয়ার বন্দোবস্ত আছে। আর এক পাশ টায় খাবারের
আয়োজন। ডেক এর ওপরে সামনের দিক টায় আমাদের
সবার বাগপত্র ডাঁই করে রাখা। চারপাশে সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছি। কে বি স্যার এর
হাতে একটা সনি এর হ্যান্ডিক্যাম। আর এস এম স্যার এর হাতের ক্যামেরা টা ক্যামেরা কম
কামান বলা ভালো। তখন এসব সম্পর্কে বিশেষ জানি-টানি না। পরে অনেক খোঁজ খবর করে
জেনেছিলাম বডি টা ক্যানন এর ৭-ডি। আর লেন্স টা ১৫০-৬০০ জাতীয় কিছু একটা হবে। তার ও
অনেক পরে জেনেছিলাম ক্যামেরা র বডি র তলায় একটা ব্যাটারি গ্রিপ ও আছে। ওতে
এক্সট্রা ব্যাটারি থাকে যাতে এধরনের ট্রিপ এ খুব সুবিধা হয়। তাছাড়া ওতে ক্যামেরার
লুক টাও অনেক প্রফেসনাল হয়।
| সুন্দরীর রাজ্যে |
![]() |
| ক্যাপ্টেন! |
বাঙ্গালীর
কাছে সুন্দরবন যাওয়া মানে বাঘ দেখা। আমার কাছেও সুন্দরবন তা বই অন্য কিছু না।
জুলজির তখন আর কত টুকুই বা জানি। কে বি স্যার এর হাত ধরে প্রথম গ্রেট, কমন আর লিটল
এগ্রেট দের চিনতে শিখি। এর আগে সবি তো সাদা বক। ম্যানগ্রোভে প্রায় ৭-৮ ধরনের
মাছরাঙ্গা পাওয়া যায়। মাছরাঙ্গাও যে এত রকমের আছে তা জানা টাও প্রবল বিস্ময়কর ছিল
বটে। আস্তে আস্তে কখন যে এসবের প্রেমে পড়ে গেলাম বুঝতেই পারিনি। এখনো মনে আছে, কে
বি স্যার সেদিন যখন ডেক এর ওপর বসে ওখানকার গাছ এর বিভিন্ন প্রজাতির গল্প করছিলেন আমরা
মন্ত্র-মুগ্ধের মত শুনে যাচ্ছিলাম। শুধু আমি না, আমাদের যে কজন সুন্দরবন গেছিলাম
তারা বোধ হয় কেউ ই ভাবতে পারিনি এর গভীরতার কথা। শুধু পাখি বা গাছের নাম চেনা টা
তো নিতান্ত সাধারণ একটা বিষয়, কিন্তু আমাদের পরবর্তী বছর গুলোর ভিত্তি ছিল
সুন্দরবন, অন্তত আমার কাছে তো বটেই, এটুকু বলতে পারি।
অনেক টা
সময় একই ভাবে কেটে গেছে। হঠাৎ মোটরের আওয়াজ বন্ধ হল। আমাদের লঞ্চ দুটো পাশাপাশি
যাচ্ছে। কি হছে বুঝতে পারছিনা। একটা নোঙ্গর করল। আর আরেকটার সাথে বেঁধে দেওয়া হল।
একটু পর দেখি দুপুরের খাবারের আয়োজন হছে। খেতে কি দিয়েছিল খুব একটা স্পষট মনে নেই
তবে ভাত, ডাল আর মাছ দিয়েছিল বলে মনে হয়। এবার খাবার আগে হাত তো ধুতে হবে। কি করা?
মেয়েরা তো বেশ হ্যান্ড-স্যানিটাইসার হাতে মেখে নিল। সমস্যা টা হল আমাদের ছেলেদের।
মানে শুধু হ্যান্ড-স্যানিটাইসারে কাজ সাড়ব এটা আমরা মেনে নিতে পারছিলাম না। তাই নদীর
জলেই হাত ধুয়ে খেতে বসলাম।
খাওয়া-দাওয়া
শেষে আবার মোটর চালু হলো। এপ্রিল এর সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে কিছুটা এলে পড়েছে।
খছাখছ শব্দ। এস এম স্যার এর হাই এফ-পি-এস শট এ কিছু উঠেছে। এলসিডি ডিসপ্লেতে
দেখলাম একটা ফ্লাইং ব্রাহ্মিনি কাইট। শঙ্খ চিল। অসাধারন!ম্যানগ্রোভে এদের ভালই
দেখা যায়।
| একি নদী না সমুদ্র? |
হঠাৎ ই খেয়াল
হল ম্যানগ্রোভ যেন তার চরিত্র পালটেছে। সেই দুপাশের ঘন জঙ্গল যেন কোথায় উবে গেছে।
যেন মাঝ সমুদ্রে আমরা। তবে কি পথ ভুল হল? ঘণ্টা সাতেকের মত আমরা স্থল ভাগের মুখ
দেখিনি। সূর্য ডুবে গেছে। আশপাশের জল যেন গাঢ় নীল হয়ে উঠেছে। দূরে কিছু জাহাজের মত
দেখা যাচ্ছে। মনে হল দূরে যেন জোনাকির মত কিছু আলো জ্বলছে। আস্তে আস্তে স্থলরেখাটা
সু-স্পষট হল। হ্যাঁ, ওখানেই আমাদের রাত্রিবাস। বালি আইল্যান্ড।
রুম
অ্যালটমেনট এর পর যে যার ঘর এ গিয়ে স্নান-টান সেরে ফ্রেশ হওয়া টাই তখন
ইম্পরট্যান্ট ছিল। আমি, অরিত্র আর দ্বৈপায়ন এক ঘর এ ঠাঁই পেলাম। স্নান- টান সেরে
এসে সবে বসেছি। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। অভিনন্দন দা, সাত্যকি দা। খানিক আডডার পর চা
এলো। সাথে আমোদী মাছের বড়া। কিছু সময় পর আট টার দিকে ডিনার এর ডাক এলো। ওখানে রাতে
খুব একটা বেরনো যায়না। খাবারের ব্যবস্থা টা যেহেতু মেয়েদের ঘর এ ছিল তাই আমাদের
বেশী রাত হওয়ার আগেই ডিনার এর ডাক পড়ল। খেয়ে এসে কথা ছিল গল্প করে ঘুমবো। কিন্তু
শরীর কি আর মানে? পরদিন ভোর বেলায় ওঠা। সারাদিন এর ক্লান্তি তে সবাই যে কখন ঘুমিয়ে
পড়লাম বুঝতেই পারলাম না।
২রা
এপ্রিল,
ভোর
চারটে-সাড়ে চারটে হবে। ঘুম ভেঙ্গে গেল। প্রথম টায় মনে হল বাড়িতেই আছি। কিছুটা সময়
যেতে ঘোর কাটলো। প্রথম টায় বুঝতে পারিনি। তারপর বুঝলাম বাকি দুজনো জেগে গেছে। বিছানায় শুয়েই খানিক
গপ্প-গুজবের মাঝে মোরগের ডাকে সকাল হল।
নাহ, আর শুয়ে থাকা চলে না। জানলার ধারে
দেখি আমাদের জন্য তিন কাপ চা রাখা। আহহ এরকম বন্য পরিবেশে যেখানে যানবাহনের কোনও
কলরব নেই, কলেজে ছোটার তাড়া নেই, শুধু আছে অনন্ত প্রকৃতি আর ভোরের এক কাপ চা, এর
থেকে ভালো আর কি ই বা হতে পারে। চা টা দ্রুত শেষ করে গেলাম নদীর ধারে। পূব দিকটা
লাল হয়ে আছে। সামনে অনন্ত জলরাশি। সূর্য সবে উঠেছে। অবাক হয়ে গেলাম। এই ভোর ই কি
আমার এতদিনের পরিচিত?
| সুন্দরবনের ভোর |
| বাঘের পাগমার্কের ট্রেল |
দোবাঁকি ওয়াচ-টাওয়ার
|
আমাদের
পরবর্তী গন্তব্য ছিল দোবাঁকি ক্যাম্প। যখন পৌঁছলাম বেলা খানিক টা পড়ে এসেছে। ওয়াচ
টাওয়ার থেকে বেশ কিছু চিতল হরিণ কে জল খেতে দেখা গেল। সুন্দরবনে কিন্তু হরিণ এর
দেখা পাওয়া খুব ই সহজ। আর দেখা পাওয়া গেল অ্যাডজুট্যানট সটঅর্ক এর। ম্যানগ্রোভে
অঞ্চলে এই পাখিটা ও প্রচুর দেখতে পাওয়া যায়। ওয়াচ টাওয়ার থেকে এস এম স্যার এর
ক্যামেরায় ধরা পরল চেঞ্জেবল হক ঈগল। দিনের শেষ টা মোটামুটি প্রথম দিনের থেকে বিশেষ
কিছু আলাদা নয়। ফিরে
![]() |
| সন্ধ্যার আড্ডা |
৩রা
এপ্রিল,
এদিন ই
ছিল এই যাত্রার শেষ দিন। প্রতিদিন এর মতই এদিন ও সকাল-সকাল ই রওনা হওয়া হল। এদিন
আমাদের দুটো ডেসটিনেসন ছিল। সজনেখালি আর সুধন্যখালি। বলার মত বিশেষ কিছু হয়েছিল
বললে বলা ভুল হবে। লাঞ্চে চিকেন ছিল গোটা ট্রিপ এ প্রথমবার। সজনেখালি তে
ম্যানগ্রোভ ইন্টারপ্রেটেশন সেনটার ঘুরে দেখবার জন্য মন্দ নয়।
ওখানে দেখা পেলাম
আমাদের নিকটতম পূর্বপুরুষ দের। বনবিবির মন্দির দর্শন করে গিয়ে উঠলাম লঞ্চ এ। দিনের শেষে আমরা সবাই খুব
ক্লান্ত ছিলাম। অনেকেই গা এলিয়ে দিয়েছে ডেক এর ওপরেই। রোদ টাও পড়ে এসেছে। বাঁধ
সাধল মাতলা। বিদ্যাধরীর পশ্চিম দিক দিয়ে এই নদী বয়ে চলেছে। নেতাধোপানির কাছে মাতলা
আর বিদ্যাধরী মিলেছে। আর এখানে এসেই মাতলার নামের মাহাত্ম্য হাড়ে হাড়ে টের পেলাম আমরা।
জল এর উত্তাল স্রোতে লঞ্চ তখন টলমল। দুপুরের খাবার ঊর্ধ্ব দিকে গমনের অভিপ্রায়
জানান দিছে। মিনিট পাঁচেক পর কিছুটা এগোতে
নদী আবার শান্ত হল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম
সবাই।
| ম্যানগ্রোভ ইন্টারপ্রেটেশন সেন্টার |
| রাতে নদীর পাড়ে |
প্রতিদিন
ঘরে ফেরার পর আমরা নদীর ঘাটে গিয়ে বসতাম কিছুক্ষণ। চারপাশ নিকশ অন্ধকার। ঝিঁঝিঁ
পোকার শব্দ ছাড়া আশেপাশে আর কোনও শব্দ নেই। সামনে দিগন্ত- বিস্ত্রিত জলরাশি। ঢেউ
গুলো পায়ের সামনে বারবার আছরে পড়ছে আর চলে যাচ্ছে। মুহূর্ত গুলো যেন থমকে গেছে।
প্রত্যক্ষ না করলে কাওকে বোঝানো মুশকিল। এই একই রকম মুহূর্ত পরে আরও একবার উপলব্ধি
করেছিলাম নাভেগাঁও লেকে। এই মুহূর্ত গুলোই
তো প্রতিদিনের জঞ্জাল থেকে বেড়িয়ে এসে খানিক মুক্তির অবসর।
একটা ছোট করে ক্যাম্প-ফায়ার হওয়ার কথা ছিল। সন্ধ্যায় আমরা যখন নদীর পাড়ে গেলাম হঠাৎ ই ওপারের দ্বীপটায় বেশ জোরালো ভাবে কয়েকটা শব্দ-বাজি ফাটল। খানিক নিস্তব্ধতার পর কে যেন বলে উঠল বাঘ বেড়িয়েছে। অতঃপর, ক্যাম্প-ফায়ার মাথায় তুলে ঘরে গিয়ে বসলাম। মেয়েদের ঘরের ছোট বারান্দাটায় সবাই বসে গল্প করছি। কে বি স্যার ডেকে নিলেন। সামনের লন টায় আমরা সবাই গিয়ে বসলাম। সামনে চেয়ারে বসে কে বি স্যার আর এস এম স্যার। পেছনে খাবার ঘর টায় ডিনারের আয়োজন চলছে। অল্প হলুদ আলোয় লন টা যেন মায়াবী হয়ে উঠেছে। আর ওপাশটায় নিকষ অন্ধকার। এটা সেটা বলতে বলতে কে বি স্যার কখন যে একটা গল্প জুড়ে দিয়েছেন বুঝতে পারিনি আমরা কেউ ই। সুন্দরবনের সেই বাঘ বেরনো রাত্তিরে খোলা আকাশের নীচে বসে সেই গা-ছমছমে গল্প টা ক্যাম্প-ফায়ার না হওয়ার দুঃখকে অনেকটা কমিয়ে দিয়েছিল।
একটা ছোট করে ক্যাম্প-ফায়ার হওয়ার কথা ছিল। সন্ধ্যায় আমরা যখন নদীর পাড়ে গেলাম হঠাৎ ই ওপারের দ্বীপটায় বেশ জোরালো ভাবে কয়েকটা শব্দ-বাজি ফাটল। খানিক নিস্তব্ধতার পর কে যেন বলে উঠল বাঘ বেড়িয়েছে। অতঃপর, ক্যাম্প-ফায়ার মাথায় তুলে ঘরে গিয়ে বসলাম। মেয়েদের ঘরের ছোট বারান্দাটায় সবাই বসে গল্প করছি। কে বি স্যার ডেকে নিলেন। সামনের লন টায় আমরা সবাই গিয়ে বসলাম। সামনে চেয়ারে বসে কে বি স্যার আর এস এম স্যার। পেছনে খাবার ঘর টায় ডিনারের আয়োজন চলছে। অল্প হলুদ আলোয় লন টা যেন মায়াবী হয়ে উঠেছে। আর ওপাশটায় নিকষ অন্ধকার। এটা সেটা বলতে বলতে কে বি স্যার কখন যে একটা গল্প জুড়ে দিয়েছেন বুঝতে পারিনি আমরা কেউ ই। সুন্দরবনের সেই বাঘ বেরনো রাত্তিরে খোলা আকাশের নীচে বসে সেই গা-ছমছমে গল্প টা ক্যাম্প-ফায়ার না হওয়ার দুঃখকে অনেকটা কমিয়ে দিয়েছিল।
৪ ঠা এপ্রিল,
সকালে বেরনো
ছিল না বলে থাকার জায়গা টাই ভালো করে ঘুরলাম। আমাদের থাকার জায়গাটা বেশ ভালো ছিল।
বিদ্যুতের অসুবিধা নেই। সব জায়গায় পর্যাপ্ত সোলার প্যানেল বসানো। জল এরও বিশেষ অসুবিধা
নেই। বাইরে টায় ল্যাংস্ত্রথ হাইভে মৌ-চাষ
হয়। বাড়ির জন্য এক বোতল মধু এনেছিলাম। সকাল
থেকেই আকাশে রাশি রাশি মেঘ জমছিল। আমরা চলে যাবো বলে কি তবে ওদের ও মন খারাপ?
খানিক টা বৃষ্টি হল। তারপর চারদিক আলো করে রোদ উঠল। এরই মধ্যে অনির্বাণ দার ক্যামেরায়
ধরা পড়ল এশিয়ান প্যারাডাইস ফ্লাইক্যাচার মেল। মন ভালো করে সবাই লঞ্চ এ উঠলাম।
ইঞ্জিন স্টার্ট হল। পেছনে সুন্দরবনের জলরাশি কে ফেলে আমাদের বাড়ি ফেরার যাত্রা
শুরু হল।
| বিদায় সুন্দরবন! |
গতকাল ই
২০১৮ এর টাইগার সেন্সাস রিপোর্ট বেরিয়েছে। তাতে দেখা গেছে সুন্দরবন এর বাঘ এর সংখ্যা
বেড়ে ৮৮ হয়েছে। এই ভালো খবরটা পেয়ে ছবছর আগের কথা গুলো মনে পড়ে গেল। অসম্ভব রকম ম্যান-অ্যানিম্যাল
কনফ্লিকট কে অতিক্রম করে ভালো থাকুক সুন্দরবনের বাঘ, সুন্দরবনের মানুষ, আর অবশ্যই
সুন্দরবন।
অনির্বাণ
৩০ শে
জুলাই, ২০১৯।



No comments:
Post a Comment